বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০২:৩০ পূর্বাহ্ন
খাইরুল ইসলাম আল আমিন ও মোরশেদ মারুফ, হালুয়াঘাট সীমান্ত থেকে ফিরে : ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট চোরাকারবারিদের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ উপজেলার তিন গ্রামের প্রায় শতাধিক রুট দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে হেরোইন, গাঁজা, মোটরসাইকেল-বাইসাইকেল, চিনি, শাড়ীসহ প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার চোরাইপণ্য ঢুকছে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ।
এর নেপথ্যে রয়েছে, ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা সংস্থার এসআই আব্দুল জলিলসহ হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, ফুলপুর, তারাকান্দা থানার কয়েকজন অসৎ পুলিশ কর্মকর্তা । ইতিমধ্যে স্থানীয় একজন ব্যক্তি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে পুলিশের লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উৎকোচ বাণিজ্য ও চোরাচালানির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। তাদের দাবি, কোনো বর্ডার ক্রাইম নেই।
হালুয়াঘাট উপজেলা সদর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার উত্তরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। এ সীমান্তে রয়েছে গোবরাকুড়া ও কড়ইতলী নামের দু’টি স্থলবন্দর। যদিও সরকারি ঘোষণা ও উদ্বোধনের পর এখনো এ দু’টি বন্দর আধুনিক রূপ পায়নি।
সরেজমিনে খোঁজ-খবর ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হালুয়াঘাট সীমান্তের কুচপাড়া, গাবরাখালী ও কচুয়াকুড়া গ্রামের প্রায় শতাধিক রুট এখন চোরাকারবারির নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এসব গ্রামের প্রায় ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকার চোরাই পণ্যের আনা-নেওয়ার জন্যও গড়ে উঠেছে নিরাপদ রুট।
এ তিন গ্রাম ছাড়াও কাতলমারী, গোবরাকুড়া, লক্ষমীকুড়া, তেলিখালী, জয়রামপুরাসহ প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষ কোনো না কোনভাবেই চোরাকারবারির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ সীমান্তের নিরাপদ এসব রুট দিয়েই প্রতিদিন দেশে আসছে ফেনসিডিল , লুঙ্গি, কাঠ, শাড়ি, চিনি, ইয়ামাহা ব্র্যান্ডের মোটরবাইক, হিরো বাইসাইকেল ও মসল্লা। চিনি ও শাড়ী আটক হলেও রাস্তায় ৫০% গায়েব হয়ে যায়। নামে মাত্র কিছু দিয়ে মামলা দেওয়া হয় তাদের ।
অভিযোগ আছে, হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও কলমাকান্দা বর্ডার দিয়ে পাচার হয়ে আসে ভারতের চিনি, সাথে আসে ফেনসিডিলও! ৩০ টি পয়েন্টে গুনতে হয় প্রায় কোটি টাকা চাঁদা। বেশি আসে চিনি ও শাড়ি। চক্রের প্রধান প্রায় ৪১ জন। চালকরা আটক হলেও আড়ালে থেকে যায় গডফাদাররা।
অভিযোগে জানা যায়, ভয়ঙ্কর সোর্স নুরু নামের এক ব্যক্তি ৩০ পয়েন্ট থেকে মাসে কোটি টাকা চাঁদা তুলেন। চাঁদা না দিলেই তার পছন্দের পুলিশ কর্মকর্তাকে দিয়ে আটক করান। পরেই শুরু হয় দরকষাকষি। ঠিকঠাক হলে রাস্তা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় চোরাচালান কারবারিদের ।
এ বিষয়ে নুরুর বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি।
সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলের চোরাচালান আসে, তা জানতে ভারত সীমান্তবর্তী জেলা হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার দুটি গ্রামে গিয়েছিলেন প্রতিদিনের কাগজ’র বিশেষ প্রতিনিধি খাইরুল ইসলাম আল আমিন ও ক্রাইম বিভাগের চিফ মোরশেদ মারুফ। তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে ভয়াবহ তথ্য। এটি প্রথম পর্ব-
চোরাই পথে ভারত থেকে যেভাবে আসে চিনি ও শাড়ী: ভারত থেকে অবৈধ পথে আনা চিনি দখল করে নিচ্ছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের বাজার। বাংলাদেশের চেয়ে ভারতে দাম কম থাকায় সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারিরা। সীমান্তের চার উপজেলা দিয়ে চোরাচালান হচ্ছে। এতে দেশি ও আমদানি করা চিনির বিক্রি কমে গেছে।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্ত দিয়ে আনা হচ্ছে ভারতীয় চিনি ও শাড়ী সাথে আসে ফেনসিডিলও। সীমান্ত দিয়ে বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেলে এসব আনা হয়। পরে পিকআপ ভ্যানে ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের বাজারে।
চিনির ৫০ কেজির বস্তা আনায় খরচ প্রায় ৩ হাজার ৮০০ টাকা। কয়েক হাত বদল হয়ে এসব চলে যায় বিভিন্ন প্রান্তে। সীমান্ত পার করার পর ভারতীয় বস্তা পরিবর্তন করে বাজারজাত করা হয়। পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে প্রতি বস্তা ৫ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। বাজারে আমদানি করা চিনির ৫০ কেজি বস্তার দাম ৬ হাজার ১৪০ থেকে ৬ হাজার ২৫০ টাকা। চোরাচালানের চিনি খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় বৈধভাবে আনা চিনির দামেই। তাই একশ্রেণির পাইকারি ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় চোরাচালানের চিনি বিক্রিতে ঝুঁকছেন। লাভবান হচ্ছে অসৎ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গাঁজা ও হেরোইনের জন্য কচুয়াকুড়া ও গাবরাখালী পয়েন্ট বেশ আলোচিত। কখনো বস্তায়, আবার কখনো মুড়ির টিনে ও চিনির বস্তায় ভরে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে গাঁজা ও হেরোইন| তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে চোরাই মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, কড়ইতলী ও গোবরাকুড়া স্থলবন্দরে প্রতিদিন বৈধপথে আসা বেশিরভাগ কয়লার ট্রাকের ছাদে বোঝাই থাকে লাউ ও কুমড়া। এসব সবজির ভেতরটা ফাঁকা করে অত্যন্ত কৌশলে সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইন।
গাবরাখালী গ্রামের আনোয়ার নামের মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি বলেন, চোরাই পণ্যগুলো ভোরে এ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। সেখান থেকে চলে যায় স্থানীয় বাঘাইতলা হাটে। সূত্র আরও জানায়, স্থানীয় পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কিছু অসৎ বর্ডার গার্ডকে ম্যানেজ করে লাখ লাখ টাকা উৎকোচ বাণিজ্যের বিনিময়ে ভারত থেকে কোটি কোটি টাকার চোরাইপণ্য প্রতিদিন এপারে আনা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা সংস্থার ওসি ফারুক হোসেন জানান, কয়েকমাসে একাধিক চোরাকারবারিদের আটক করে ডিবি পুলিশ। নিয়মিত মামলা হয়েছে। মামলা তদন্ত হচ্ছে, পেছনে কারা জড়িত তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। আমাদের কোন সদস্য জড়িত থাকলে কোন ছাড় নয়, অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
মূলত এদের ছত্রছায়াতেই অবৈধ সীমান্ত বাণিজ্যে দু’দেশের চোরাকারবারিদের মধ্যে গড়ে উঠেছে এ বিশেষ নেটওয়ার্ক, এমন অভিযোগও নিরীহ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
তবে উৎকোচ বাণিজ্য ও চোরাচালানির অভিযোগ অস্বীকার করে হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন চন্দ্র রায় বলেন, উৎকোচের বিষয়টি আমার জানা নেই তবে নুরু নামের ব্যক্তি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে দেখবো। তাছাড়া সিমান্ত এলাকায় বর্ডার গার্ড নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশের অন্যান্য সীমান্তের তুলনায় এ সীমান্ত তুলনামূলকভাবে ভালো। তিনি আরও বলেন, বিজিবি ও পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করে ভারত থেকে কোন কিছুই আসা সম্ভব নয়। এখানে বর্ডার ক্রাইম জিরো টলারেন্সে রয়েছে। ফেনসিডিল ও মদ আসা বন্ধ হয়েছে।
ধোবাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) টিপু সুলতান এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, আমার এলাকায় পুলিশ প্রশাসনসহ বিজিবি খুবই তৎপর। সীমান্ত এলাকা দিয়ে কোন যানবাহন চেকিং ছাড়া যেতে পারে না। পুলিশের সাথে যোগসাজসের কথা তিনি অস্বিকার করে বলেন প্রশ্নই আসে না অপরাধীদের সাথে পুলিশের কোন প্রকার যোগসাজস নেই । যদি কেউ পুলিশের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি করে থাকে তাহলে অভিযোগের প্রেক্ষিতে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারতীয় পণ্য কিভাবে ময়মনসিংহে আসে তা জানতে চাইলে তারাকান্দা থানার ওসি আবুল খায়ের ও ফুলপুরের ওসি মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, আমাদের এলাকায় তো সীমান্ত নেই। রাতে আমাদের টহল পুলিশ থাকে তারা চেকিং করে। চেকিংএ অবৈধ কিছু পাওয়া গেলে মামলা দেয়া হয়। এদিকে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।